একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতি যখন সভ্যতার চরম শিখরে ঠিক তখনই জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাস বিশ্বের অস্তিত্বকে আজ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বৈরী জলবায়ুর প্রভাব মানবসভ্যতার জন্য আজ সবচেয়ে বড় হুমকি। Bagnladesh Institute of International and Strategic Studies (BIISS) এর মধ্যে ‘Climate change is predicated to have an overall negative impact on long term security and conflict dynamics, acting as a threat multiplier that increases the volatility of existing causes of confilict and many generate new insecurities. জলবায়ু এ পরিবর্তনে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় খরার প্রকোপ বাড়বে। শুধু তাই নয়, সুন্দরবনও সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে গরমকালে প্রচন্ড তাপদাহ, আবার শীতের প্রকোপ এবং শীতকালে শীতের তীব্রতা এবং কোনো কোনো সময় অনাকাক্ষিত গরম পড়া, শীতকালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়া, বৃষ্টির দিনে কম বৃষ্টি, অকাল বন্যা, বন্যার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান, শিলাবৃষ্টি এ দেশের আবহমান আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

পঞ্চগড়ে ১০-১২ বছর ধরে অস্বাভাবিক শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ধানে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। শ্রীমঙ্গল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অতীতে এ দেশে প্রায় আট হাজার প্রজাতির ধান উৎপাদিত হতো। এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে এসব জাত। আগামী ৫০ বছরে ধানের উৎপাদন এক-দশমাংশ কমার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এভাবে বিলুপ্ত হতে পারে আলুর বিভিন্ন প্রজাতির এক-চতুর্থাংশ। এছাড়া ২০ শতাংশের বেশি মাছের প্রজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ১৭টি নদী। বিশ্ব জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি-২০০৬ এর মূল্যায়নে যে ১০টি দেশকে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাংলাদেশ সে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে এবং হন্ডুরাস রয়েছে প্রথম স্থানে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আইনুন নিশাতের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো হলো- বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়া, সঠিক সময়ে শীত শুরু না হওয়া, শীতের প্রকোপ কমে যাওয়া, শীতকালের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া, প্রতিবছর তাপমাত্রা অল্প করে বৃদ্ধি পাওয়া, আগাম পানি আসা, পানির চাপ বাড়া।

২০৩০ সালে বাংলাদেশের জলবায়ুর অবস্থা দাঁড়াবে গরমকালে তাপমাত্রা ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমবে। গরমকালে বৃষ্টিপাত বাড়বে শতকরা ১১ ভাগ কিন্তু শীতকালে কমবে শতকরা ৩ ভাগ। গরমকালে বাষ্পীভবন বাড়বে শতকরা ১৮.৮ ভাগ এবং শীতকালে বাড়বে শতকরা ০.৯ ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে রয়েছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে বীজ গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতা হতে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্ধিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সাথে ফসল চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। গড় তাপমাত্রা বাড়ার কারণে গম, ছোলা, মসুর, মুগডালসহ কিছু কিছু ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকরাও এসব চাষে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গমের বীজ গজানোর তাপমাত্রা হলো ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর কম বেশি হলে বীজ গজাবে না। বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর প্রকাশিত টাস্কফোর্স রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সাল পর্যন্ত এক মিটার বাড়তে পারে। এর প্রভাবে তিন হাজার মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে, ২০০ মিলিয়ন টন ধান, গম, আখ, পাট, মটরসহ রবিশস্য উৎপাদন কমে যাবে।

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা প্রকৃতিনির্ভর। ৭০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৪% আসে কৃষি থেকে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৪%। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো সবুজ বিপ্লবের ফলে তথা নানারকম ফসলের জাত উন্নয়নে গত ৫০ বছরে দানাশস্যের ফলন বেড়েছে কয়েকগুণ। উচ্চফলনশীল ধান ও গমের জাতের সূচনার ফলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষির অন্যান্য শাখা তথা পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত ক্ষেত্র। বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতিতে পরিবেশবান্ধব টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়নে কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে জোরদার করার ওপর যথার্থ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।

কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবিত নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে প্রান্তিক চাষিদের কাছে পৌঁছানোর ওপর কৃষি উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমাদের দেশের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তির অধিকাংশই কৃষকের মাঠে প্রয়োগের আগে বা অব্যবহিত পরই জীবনকাল হারায়। উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তিকে প্রকৃত ব্যবহার করতে হবে। কৃষকের খামারে। মাঠে দ্রুত পৌঁছাতে বর্তমান কৃষি সম্প্রসারণ কৌশল এবং মোবাইল ফোন সংযোজনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক্স এগ্রিকালচার তথা ই-কৃষির প্রচলন প্রয়োজন।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। আর কৃষির উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভর করে তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়ন তো বটেই, পরিবর্তনশীল কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিশ্ব এখন তথ্য প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

পরিবর্তনশীল কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে বাংলাদেশের কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। তবে এর সুফল কৃষকপর্যায়ে নিবিড়ভাবে অদ্যাবধি পোঁছায়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে কাজ করতে হবে নিজেদেরই স্বার্থে, ভবিষ্যতের প্রশ্নেও উন্নয়নের স্বার্থেই। তথ্যসূত্র:এআইএস