নারীদের অসম্মান ও ভোটাধিকার হরণকারীরা দেশপ্রেমিক হতে পারে না: তারেক রহমান

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যারা নারীদের অসম্মান করে, মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে—তারা কখনো দেশপ্রেমিক কিংবা জনদরদি হতে পারে না। এসব শক্তি মূলত দেশের অগ্রযাত্রার প্রধান অন্তরায়।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পৌনে ১টার দিকে খুলনার খালিশপুর প্রভাতী স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে তারেক রহমান জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হলে হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। সকাল সোয়া ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা কাজী আবু রহীম। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

তারেক রহমান বলেন, শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন। দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। একটি শ্রেণিকে বাদ দিয়ে কখনোই দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা চালু করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।

নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না। সম্প্রতি তাদের এক নেতা কর্মজীবী মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বলতেও লজ্জা লাগে। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো জাতির জন্যই কলঙ্ক।

তিনি বলেন, লক্ষাধিক নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু নারী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ আজ তাদেরই অপমান করা হচ্ছে।

ইসলামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে—নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। সুতরাং নারীদের কর্মজীবনকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারও নেই।

ওই রাজনৈতিক দলটির বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তারা আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যা বলে তারা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করছে।

তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি ও ধানের শীষের এই জনসভা। গত ১৫–১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এ সময়ে অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মী গায়েবি মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, টানা ১৬ বছর বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। জাতীয় নির্বাচন তো বটেই, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ কথা বলার অধিকার হারিয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এখন সময় এসেছে অধিকার পুনরুদ্ধারের। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ইনশাল্লাহ জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।

বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য চালু করা হবে ‘কৃষি কার্ড’, যার মাধ্যমে তারা ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশকসহ নানা সরকারি সুবিধা পাবেন।

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবার একটি জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।

তিনি আরও বলেন, তরুণদের জন্য আইটি পার্ক গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ চালু করা হবে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।

জনসভায় আরও বক্তব্য দেন খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনের প্রার্থী ও সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ আসনের আলি আসগর লবী, সাতক্ষীরা-১ আসনের হাবিবুর রহমান হাবীবসহ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন আসনের বিএনপি প্রার্থীরা এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।