আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনী পরিবেশ শৃঙ্খলিত ও নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে থাকবে বিশেষ নজরদারি।
সরকার জানিয়েছে, নির্বাচন ঘিরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল বা জাল ভোটের চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন।সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, প্রধান উপদেষ্টার “এবারের নির্বাচন ইতিহাস হয়ে থাকবে”—এই অবস্থান থেকে সরকার একচুলও নড়েনি।
আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে অপতথ্য, গুজব ও ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা রোধে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনিটরিং করছে। ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি যেন না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনী মাঠে নেমেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনীকে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তর ৭৩ দফা নির্দেশনা সংবলিত একটি বুকলেট প্রকাশ করেছে। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে এটি সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘অপারেশন্স কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে ঝুঁকিভিত্তিক কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ, স্ট্রাইকিং ফোর্সের লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং ও বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে তদারকি করা হচ্ছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন জানান, এবার ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার ও বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মাঠে রয়েছে। সারাদেশে ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে যৌথ টহল ও অভিযান চালানো হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, অতীতের বিতর্ক কাটিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে ডিএমপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজধানীতে ৩৭টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী এলাকায় আইনের ব্যত্যয় ঘটলে কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের বাধ্যবাধকতা, যা এবার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, আরপিও-১৯৭২ ও ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো অনুযায়ী কেন্দ্র দখল, অস্ত্র প্রদর্শন, ব্যালট ছিনতাই বা ভোটারকে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা হবে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে সিআরপিসির ১২৭–১৩২ ধারা অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে এআইভিত্তিক ভুয়া কনটেন্ট ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে কেন্দ্র দখল ও সহিংসতার মতো অপরাধ কার্যত শূন্যে নেমে আসবে।



