ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিনে বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নিউইয়র্ক ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে পবিত্র কোরআন হাতে শপথ গ্রহণ করেছেন তরুণ ডেমোক্র্যাট নেতা জোহরান মামদানি। শপথ নিয়েই থেমে থাকেননি তিনি—নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রত্যয়ে মাঠে নেমেছেন এই মিলেনিয়াল নেতা।

মামদানির দাবি, অচিরেই নিউইয়র্ক এমন এক দৃষ্টান্তে পরিণত হবে, যা বিশ্বের অন্যান্য শহর অনুসরণ করবে। শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানায়।

ডিসেম্বরের তীব্র শীত উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নগরীর হাজারো মানুষ ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতার অভিষেক অনুষ্ঠান উদযাপন করতে হাজির হন। মাত্র এক বছর আগেও যিনি ছিলেন প্রায় অচেনা, সেই মামদানির উত্থান অনেকের কাছেই রূপকথার গল্পের মতো। স্থানীয় পার্লামেন্ট সদস্য থেকে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র—এই পথচলায় তিনি অসংখ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর সমর্থকদের প্রত্যাশাও পৌঁছেছে আকাশচুম্বী উচ্চতায়।

রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন মামদানি। পরে তিনি সিটি হলের বাইরে আয়োজিত দ্বিতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন,
“অনেকে প্রশ্ন তোলে—বামপন্থিরা আদৌ প্রশাসন চালাতে পারবে কি না, মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না। আমরা নিউইয়র্কবাসীরা যেভাবে সবকিছু অন্যদের চেয়ে ভালোভাবে করি, ঠিক সেভাবেই তার জবাব দেব। আমরা সারা বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করব।”

প্রায় ২৪ মিনিটের ভাষণে তিনি আরও বলেন, “আজ থেকে আমরা সাহসিকতার সঙ্গে, বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শাসন করব।”

নির্বাচনী প্রচারণার সময় মামদানি বারবার জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যারা উপেক্ষিত ও প্রতারিত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াবেন।

চার হাজার দর্শক টিকিট কেটে জনসম্মুখে আয়োজিত ‘দ্বিতীয় শপথগ্রহণ’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে তার বামপন্থি মিত্র, জনপ্রিয় ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ও কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ বক্তব্য দেন।
স্যান্ডার্স বলেন, “আমরা এমন একটি সরকার গড়তে চাই, যা সবার জন্য কাজ করবে—শুধু ধনী ও নির্বাচিত কিছু মানুষের জন্য নয়।”
তিনি এমন দৃষ্টিভঙ্গির নেতা হিসেবে মামদানিকে নির্বাচিত করায় নিউইয়র্কবাসীকে ধন্যবাদ জানান।

ভাষণের একপর্যায়ে দর্শকরা ‘ধনীদের ওপর কর আরোপ কর’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের সবচেয়ে ধনী বাসিন্দাদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ মামদানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।

অনুষ্ঠানটি বড় পর্দায় দেখার জন্য ডাউনটাউন ম্যানহাটনে হাজারো মানুষ জড়ো হন। তাদের অনেকের মাথায় ছিল ‘জোহরান’ লেখা হলুদ-নীল বিনি টুপি।
৩১ বছর বয়সী বিজ্ঞানী জ্যাকব বায়ারলি এএফপিকে বলেন, “আমাদের জীবনে এই প্রথম আমরা প্রকৃত রাজনৈতিক আশাবাদ অনুভব করছি।” তার পাশে ছিলেন স্ত্রী অবার্ন।

সারা শহরজুড়েই এদিন ছিল উৎসবের আবহ। যেমন ব্যতিক্রমী ছিল মামদানির নির্বাচনী প্রচারণা, তেমনি অভিনব ছিল তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানও।

জোহরান মামদানি একাধারে নিউইয়র্কের প্রথম দক্ষিণ এশীয়, মিলেনিয়াল ও মুসলিম মেয়র। তিনিই প্রথম মার্কিন মেয়র, যিনি পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিলেন।
৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতা শপথ নেন দুটি কোরআন হাতে—একটি তার দাদার কাছ থেকে পাওয়া, অন্যটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ধার করা প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি কোরআন।

পুরনো সিটি হলের নিচে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে অনাড়ম্বর এই অনুষ্ঠানে তাকে শপথ পাঠ করান নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস। সে সময় তার পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

নিউইয়র্কের অধিকাংশ পূর্ববর্তী মেয়র বাইবেল হাতে শপথ নিলেও সংবিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই।

উল্লেখযোগ্য যে, ব্যবহৃত কোরআনের একটি কপি ছিল মামদানির দাদা-দাদীর কাছ থেকে পাওয়া, আর অন্যটি আঠারো শতকের শেষভাগ বা উনিশ শতকের শুরুর দিকের একটি ক্ষুদ্র পকেট কোরআন, যা নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির শমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের সংগ্রহ থেকে নেওয়া।

সব মিলিয়ে জোহরান মামদানির শপথ গ্রহণ ছিল একেবারেই রূপকথার মতো। বিপুল প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়েও তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন আশার আলো। সংশ্লিষ্ট মহলের বিশ্বাস, এক সময়ের গায়ক ও বহুভাষিক সমাজে স্বচ্ছন্দে একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারা এই নেতা নিউইয়র্কে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছেন।