জীবিত অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন —“এই দেশেই আমার জন্মস্থান, এই দেশেই আমার মৃত্যু হবে, আর এই দেশের মানুষের মাঝেই আমি বাঁচতে চাই।”
দেশ ও দেশের মানুষের জন্য সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করা, প্রলোভন ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো আপোষ না করা, নির্মম নির্যাতন সহ্য করা এবং বারবার কারাবরণের মধ্যেও অনমনীয় থাকার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থাতেও তাঁর আপোষহীন মনোভাব ও গণতন্ত্রের প্রতি অটল অবস্থান ছিল স্পষ্ট। দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিদায়ের মুহূর্তে দেশবাসী তাকে উপহার দিয়েছেন ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধা।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের ঢল দেখা যায়। জানাজার মাঠ থেকে শুরু করে আশপাশের সড়কজুড়ে, বিজয় সরণী, আগারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলা মোটর, শ্যামলী, ধানমন্ডি—সব জায়গা মানুষের স্রোতে প্লাবিত হয়ে ওঠে। যারা তাঁর জন্য কারাবরণ সয়েছেন, যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সংগ্রাম করেছেন—সেই লাখো মানুষের অশ্রু ও ভালোবাসার মধ্যেই শেষ বিদায় গ্রহণ করেন তিনি। অনেকের ভাষায়, “একটি কফিনের পাশে যেন পুরো বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে ছিল।”
জানাজায় দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী—সকলেই উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরাও শ্রদ্ধা জানান। শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন খালেদা জিয়া।

নির্ধারিত সময়ের পর বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। নামাজ পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ়তার কথা তুলে ধরেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ছেলে তারেক রহমান অনুরোধ করেন—যদি তাঁর মায়ের জীবদ্দশায় কারো প্রতি কোনো ঋণ বা কষ্ট থেকে থাকে, তা যেন তাঁকে জানানো হয় এবং তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল-সবুজে মোড়ানো কফিন জিয়া উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে পূর্ণ মর্যাদায় দাফন করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। বড় ছেলে তারেক রহমান নিজ হাতে মাকে কবরে শায়িত করেন। সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
পুরো সময়জুড়ে সংসদ ভবন এলাকা ও জিয়া উদ্যানে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবুও লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—গণমানুষের নেত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর জায়গা করে নিয়েছেন।



