১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্যতম পথ প্রদর্শক হিসেবে তিনি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্থায়ী স্থান অধিকার করে আছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশকে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার সাহসী নেতৃত্ব, দূরদর্শী চিন্তা ও উদ্যোগ আজও মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। আজ তার ৯০তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে জাতি স্মরণ করছে এক নীরব অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতাকে, যিনি নিজের কর্ম, দর্শন ও স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস অভিযানের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেজর জিয়া ঐতিহাসিকভাবে ঘোষণা করেন ‘উই রিভোল্ট’। তার সেই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকে ত্বরান্বিত করে। পরদিন কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণায় তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বিশ্ব শান্তির পক্ষে কাজ করবে।

ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না জিয়াউর রহমান। আড়াই শতাধিক সৈন্য নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ সংগঠিত করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

জিয়াউর রহমানের শিক্ষাজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। বগুড়া থেকে করাচি পর্যন্ত শিক্ষাজীবন শেষে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর তিনি কুমিল্লার ৪৪তম ব্রিগেডের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।

১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন ও বৈধতা অর্জন করেন। তার নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রাম ও শহরভিত্তিক উন্নয়ন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, খাল খনন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে তার উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বৈদেশিক নীতি ও কূটনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যান।

তবে দেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯৮১ সালের ২৯ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর জানাজায় প্রায় ২০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

শৈশবের ‘কমল’ নামের এক সাধারণ শিশু থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনা কর্মকর্তা, রাষ্ট্রপতি ও সফল রাষ্ট্রনায়ক—জিয়াউর রহমানের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ইতিহাসের অংশ। তার রাজনৈতিক দর্শন, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম আজও জাতির মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও প্রেরণা জাগিয়ে রাখে।

শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে—দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্বই একজন সত্যিকারের সফল রাষ্ট্রনায়কের পরিচয়।