বিগ ব্যাং-এর অনুকরণে দুর্ঘটনাবশত সিসা থেকে সোনা তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা
সুইজারল্যান্ডের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (LHC) ‘এলিস’ পরীক্ষায় কাজ করা বিজ্ঞানীরা এক অসম্ভব ঘটনাকে সম্ভব করে তুলেছেন। মহাবিশ্ব সৃষ্টির বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরের অবস্থা কেমন ছিল, তা বোঝার জন্য তারা প্রচণ্ড গতিতে সিসার পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটাচ্ছিলেন। আর সেখানেই ঘটনাক্রমে তৈরি হয়ে যায় অতি সামান্য পরিমাণ সোনা।
সিসা ও সোনার মধ্যে মূল পার্থক্য তাদের পরমাণুর প্রোটন সংখ্যায়। সিসার পরমাণুতে সোনার চেয়ে তিনটি প্রোটন বেশি থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকেমিস্টদের স্বপ্ন ছিল সিসাকে সোনায় রূপান্তর করা। আধুনিক বিজ্ঞানে জানা যায়, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এটি অসম্ভব। তবে পারমাণবিক স্তরে প্রোটনের সংখ্যা পরিবর্তন করা গেলে এমন রূপান্তর তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের মতে, সিসার নিউক্লিয়াস থেকে যদি ঠিক তিনটি প্রোটন বের করে দেওয়া যায়, তাহলে সেটি সোনার নিউক্লিয়াসে পরিণত হতে পারে। তবে এই কাজ অত্যন্ত কঠিন, কারণ নিউক্লিয়াস শক্তিশালী পারমাণবিক বলের মাধ্যমে আবদ্ধ থাকে।
এলএইচসিতে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে সিসার নিউক্লিয়াস একে অপরের দিকে ছুড়ে দিয়ে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসগুলো সরাসরি সংঘর্ষ না করে খুব কাছ দিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। তখন তাদের মাঝখানে সৃষ্ট তীব্র তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র নিউক্লিয়াসকে কাঁপিয়ে দেয় এবং কখনো কখনো কয়েকটি প্রোটন ছিটকে বেরিয়ে আসে।
যেসব ক্ষেত্রে ঠিক তিনটি প্রোটন বেরিয়ে যায়, সেসব সিসার নিউক্লিয়াস সোনায় রূপান্তরিত হয়। ‘এলিস’ পরীক্ষায় ব্যবহৃত বিশেষ ডিটেক্টর ‘জিরো-ডিগ্রি ক্যালরিমিটার’-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বেরিয়ে যাওয়া প্রোটনের সংখ্যা গণনা করে পরোক্ষভাবে এই সোনার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, সিসার নিউক্লিয়াস সংঘর্ষের সময় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮৯ হাজার সোনার নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। তবে মোট পরিমাণ এতই নগণ্য যে তা প্রায় ২৯ ট্রিলিয়নথ গ্রামের সমান। এ ছাড়া একই প্রক্রিয়ায় থ্যালিয়াম ও পারদের মতো মৌল তৈরির প্রমাণও মিলেছে।
এই রূপান্তরের ফলে সংশ্লিষ্ট নিউক্লিয়াসগুলো আর এলএইচসির বিমপথে স্থির থাকতে পারে না এবং অল্প সময়ের মধ্যেই যন্ত্রের দেয়ালে আঘাত করে। এতে বিমের তীব্রতা কমে যায়, যা পরীক্ষার জন্য বরং সমস্যাই সৃষ্টি করে।
তবু দুর্ঘটনাবশত ঘটে যাওয়া এই ‘আধুনিক অ্যালকেমি’ বোঝা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী কণাত্বরক ও পরীক্ষার নকশা তৈরিতে এই জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



