বাংলাদেশের উপকূলীয় ও গ্রামীণ অঞ্চলে নারিকেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। দীর্ঘদিন ধরেই এটি কৃষকদের আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে পরিচিত। এখন দেশে নারিকেল গুড় উৎপাদন প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। মূলত, নারিকেল গাছের কচি ফুলের মোচা থেকে খুব সহজেই রস সংগ্রহ করা যায়। পরবর্তীতে সেই সংগৃহীত রস প্রক্রিয়াজাত করে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর গুড় তৈরি করা সম্ভব। তাই, প্রাকৃতিক এই মিষ্টিজাত পণ্যটি দেশের খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
রস সংগ্রহের বিশেষ পদ্ধতি ও নীরা
নারিকেল গাছের কচি মোচা থেকে বিশেষ এক কৌশলে রস সংগ্রহ করা হয়। মূলত, প্রথমে মোচার অগ্রভাগ খুব পরিষ্কারভাবে কেটে নেওয়া হয়। এরপর সেখানে একটি পরিষ্কার পাত্র অত্যন্ত সাবধানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত দিনে দুইবার অর্থাৎ ভোরবেলা ও বিকেলে এই রস সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত এই তাজা ও মিষ্টি তরল রস স্থানীয়ভাবে “নীরা” নামে পরিচিত। তবে, রস যাতে দ্রুত নষ্ট না হয়, সেজন্য পাত্রে সামান্য প্রাকৃতিক উপাদান বা চুন ব্যবহার করা হয়।
নারিকেল গুড় উৎপাদন এবং জ্বাল দেওয়ার প্রক্রিয়া
সংগ্রহ করা রস দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গুড় তৈরি করা হয়। প্রথমে ছাঁকনি বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে রসটি খুব ভালোভাবে ছেঁকে নেওয়া হয়। এরপর একটি বড় কড়াইয়ে ঢেলে ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। রস ফুটতে থাকলে উপরে জমা হওয়া ফেনা তুলে ফেলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেওয়ার ফলে রস ঘন হয়ে আঠালো আকার ধারণ করে। নির্দিষ্ট ঘনত্বে পৌঁছালে তা ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করে মজবুত ও সুস্বাদু গুড়ে পরিণত করা হয়।
স্বাস্থ্যসম্মত গুড়ের চমৎকার গুণাগুণ ও ব্যবহার
নারিকেল গুড় প্রাকৃতিক শর্করা এবং শক্তির একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট উৎস। এছাড়া, এতে প্রচুর পরিমাণে দরকারি খনিজ উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। মূলত, এটি পিঠা, পায়েস, চা এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পরিশোধিত বা রিফাইন করা চিনির তুলনায় এটি স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী। তাই, বাজারে বর্তমানে এই স্বাস্থ্যসম্মত গুড়ের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সুতরাং, এই পণ্যটি বাজারজাত করলে কৃষকরা দারুণভাবে লাভবান হবেন।
গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিএসআরআই (BSRI)
এই চমৎকার প্রযুক্তিটি নিয়ে ২০১৫ সালে একটি বড় কাজ শুরু হয়। মূলত, বিএসআরআই (BSRI) ঈশ্বরদী-পাবনার সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবুল হাসনাত এই গবেষণা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির পদ্ধতি উন্নয়নে কাজ করেছেন। কিন্তু, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে তা বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা তখন সম্ভব হয়নি। তবে তার এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, এটি দেশের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক শিল্প হতে পারে।
নারিকেল গুড় উৎপাদন ও আগামী দিনের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেল রস থেকে গুড় তৈরি একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্যোগ। এটি গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে, এটি প্রান্তিক কৃষকের অতিরিক্ত আয় বৃদ্ধিতেও অনেক সাহায্য করবে। বাংলাদেশে নারিকেল গাছের প্রচুর প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও এর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো হয়নি। পরিশেষে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিলে অর্থনীতি আরও অনেক বেশি মজবুত হবে।
Md. Abul Hasnat
Ex Scientific Officer (SFFMCC Project)
BSRI, Ishurdi, Pabna
ইমেইল: hasnatabul2016@gmail.com



