দেশের ব্যাংক খাতে এখন চরম অস্থিরতা ও সংকট বিরাজ করছে। মূলত, বিগত সরকারের আমলে ডজন খানেক ব্যাংক ব্যাপকভাবে লুটপাট করা হয়েছিল। ফলে, এই ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে একদম দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে পড়েছে। তাই, তারা গ্রাহকের আমানতের সাধারণ অর্থও এখন ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিশাল অঙ্কের টাকা ধার দিয়েছিল। কিন্তু, বছর পার হলেও ১২টি ব্যাংক সেই ধারের টাকা ফেরত দেয়নি। সুতরাং, ৬৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ধার দিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ধারের বিস্তারিত তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংক এই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে ধার দিয়েছিল। মূলত, তিন মাসের জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তাদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা সেটি এখনো পরিশোধ করেনি। বিদায়ী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার প্রথমে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা দেন। এরপর, নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর আরও ৫১ হাজার কোটি টাকা দেন। তাই, সব মিলিয়ে ধারের পরিমাণ প্রায় ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে, দেশের পুরো ব্যাংক খাতে এখন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঋণ পাওয়া ১২টি ব্যাংকের তালিকা
ধার পাওয়া এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি পরিচিত নাম রয়েছে। মূলত, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পেয়েছে। একইভাবে, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকও বিপুল টাকা নিয়েছে। কারণ, এই ব্যাংকগুলোতে আগে এস আলমসহ কয়েকটি বড় গ্রুপের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ছিল। সুতরাং, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়। কিন্তু, অতিরিক্ত লুটপাটের কারণে তারা নিজেদের পায়ে এখনো দাঁড়াতে পারছে না।
সংকটের কারণ ও অর্থনীতিবিদদের মত
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ব্যাংক খাতের এই বিশাল ক্ষত লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তাই, তখন তারল্য সংকট মেটাতে অবৈধভাবে অনেক আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, শুধু টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, এটি মূলত ইনফেকশনে সাময়িক মলম লাগানোর মতো একটি কাজ। সুতরাং, মূল সমস্যা দূর করতে খেলাপি ঋণ ও ব্যাপক দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। পরিশেষে, লুটপাটের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বর্তমান অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী এই বিশাল অর্থ দেওয়া হয়েছিল। মূলত, সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে ৯০ দিন মেয়াদে এই ধার দেওয়া হয়। কিন্তু, এই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় নতুন করে অনেক সংকট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, এভাবে বারবার তারল্য সহায়তা দেওয়া আর মোটেও ঠিক হবে না। কারণ, এতে দেশের ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থাহীনতা আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে। তাই, নতুন গভর্নরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।


