বিএনপির জন্য ‘এবারই সময়’: জামায়াতকে দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই

কথায় আছে—নিজে যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রতিপক্ষকে কখনোই দুর্বল ভাবা উচিত নয়। প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখাই অনেক সময় নিজের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত ৩১ জানুয়ারি বগুড়ার এক নির্বাচনী সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একই উপলব্ধির কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকলে চলবে না, সবার কাছে যেতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জয়ের আশা করা যাবে না।”

তারেক রহমানের এই উপলব্ধি যথার্থ। এখন প্রয়োজন এই উপলব্ধির আলোকে বিএনপির নির্বাচনী ফ্রেমওয়ার্ক নতুন করে সাজানো। কারণ, এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার কোনো সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী

দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই শক্তি কার্যত অনুপস্থিত। সেই শূন্যতা পূরণ করে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী—যে দলটি একসময় বিএনপির ছায়াতলে রাজনীতিতে বেড়ে উঠেছিল।

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আসন ও ভোট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসমর্থনের দিক থেকে জামায়াত বরাবরই বিএনপির অনেক পেছনে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের অতিমাত্রায় উচ্চকণ্ঠ প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট’ বাহিনীর আগ্রাসী তৎপরতায় মনে হচ্ছে—দলটি যেন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে, অপেক্ষা শুধু নির্বাচন।

নির্বাচন যেহেতু এক ধরনের পাওয়ার গেম, সেখানে আদর্শ বা নৈতিকতা অনেক সময় গৌণ হয়ে পড়ে। বিজয়ই মুখ্য। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই জামায়াত প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জামায়াতের সংগঠিত কৌশল বনাম বিএনপির আত্মতুষ্টি?

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত জামায়াত যেভাবে অর্থ, সংগঠন ও জনসংযোগ ব্যবহার করছে—বিএনপি কি তা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারছে? এটি সত্য, বিএনপির জনপ্রিয়তা ব্যাপক এবং মানুষ দলটির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু জনপ্রিয়তাই কি নির্বাচনী বিজয়ের একমাত্র শর্ত?

শহর, গ্রাম ও বস্তি এলাকায় আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের ভোট নিশ্চিত করতে বিএনপি কি সুপরিকল্পিত কোনো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে? নাকি এই ধারণায় বসে আছে—জনগণ বাধ্য হয়েই বিএনপিকে ভোট দেবে?

প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট জামায়াত নেতার বাসা থেকে উদ্ধারের ঘটনায় বিএনপি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের নানা উপায়ে নিজেদের পক্ষে টানছে, তখন শুধু অভিযোগ করে কি ফল পাওয়া যাবে?

তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক প্রশ্ন

এতে সন্দেহ নেই, তারেক রহমান দেশে ফেরার পর গণসংবর্ধনায় দেওয়া বক্তব্য এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মানুষের ব্যাপক সাড়া মিলেছে। যেখানে তিনি যাচ্ছেন, লাখ লাখ মানুষ সমবেত হচ্ছে। মানুষ তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছে, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

তবু একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে—তার নির্বাচনী সভাগুলোতে দলের সিনিয়র ও পরীক্ষিত নেতারা কোথায়? শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী সভায় তাঁদের পাশে থাকতেন দলের রাজনৈতিক পিলাররা। এতে নেতৃত্বের শক্তি ও আস্থার প্রতিফলন ঘটত।

বর্তমানে অনেকেই জানতে চাইছেন—তারেক রহমানের পাশে যারা বসছেন, তারা কারা? বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অনুপস্থিতি কেন চোখে পড়ছে?

জামায়াতের গুপ্ত রাজনীতি ও বহুমুখী তৎপরতা

আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রকাশ্য রাজনীতিতে কম সক্রিয় থাকলেও জামায়াত তখন গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এবারের নির্বাচনে জামায়াত ধর্মীয় আবেগ, সংখ্যালঘু ভোট, নারী ভোট—সবকিছুকেই কৌশলে ব্যবহার করছে। গৃহিণীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা, আর্থিক সহায়তা, উপহার, এমনকি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবার মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বিএনপি কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত?

বিদ্রোহী প্রার্থী ও ভোট বিভাজনের ঝুঁকি

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিএনপির ভেতরের বিদ্রোহী প্রার্থী। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৯টি আসনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এতে ভোট বিভাজনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি জামায়াতকে সুবিধা করে দিচ্ছে।

শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা পরাজিত হলে দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপির ঘাড়েই পড়বে। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

এবারই সময়, নয়তো আর নয়

বিপুল জনসমর্থন থাকলেই নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত হয় না—ইতিহাস তার প্রমাণ। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় আমাদের তা-ই শেখায়।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের সুযোগ নেই। কিন্তু জামায়াতকে দুর্বল ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগও নেই। এখনই সময় দলের সিনিয়র নেতৃত্ব, মিত্র দল ও নীতি-নির্ধারকদের এক টেবিলে বসে সুসমন্বিত নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ করার।

তারেক রহমান নিঃসন্দেহে একাই এক শ’। কিন্তু তার পাশে যদি দলের পরীক্ষিত পিলাররা দৃশ্যমানভাবে থাকেন, তাহলে সেই শক্তি কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

এবারই সময়—দিস টাইম অর নেভার