ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গাড়িটা প্রায় দুয়ায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের জোর প্রচারণায় জন জীবনে কিছুটা ভোগান্তি তৈরী হলেও মানুষের উৎসাহে কোন কমতি নেই। চায়ের কাপে এখন বইছে তুমুল ঝড়। কে হবেন বাংলাদেশের পরবর্তি প্রধানমন্ত্রী? কে পেতে যাচ্ছেন দেশের ১৮ কোটি মানুষের কল্যাণ সাধনের চাবি? নানা জনের নানা মত! বিভিন্ন মাধ্যমের সংবাদ ও বিশ্লেষণ থেকে মনে হচ্ছে বগুড়ার করতোয়া নদীর তীরেই ভিড়তে যাচ্ছে আগামী প্রধানমন্ত্রী’র তরী। পুন্ড্রনগরের রাজধানীতে আবার নেতৃত্বের মুকুট ফিরে আসতে যাচ্ছে।

আসন্ন ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৭.৬% থেকে ৬২% ভোটার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার মনস্থির করেছেন বলে বিভিন্ন জরীপের ফলাফলে উঠে এসেছে। জরীপগুলোর প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়, এবার ঝুলন্ত সংসদ গঠনের কোন সম্ভাবনা নেই। নির্বাচনের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের ভোটারদের বড় অংশই বিএনপিকেই ভোট দিবে বলে কোন কোন জরীপে উঠে এসেছে। এর বড় কারণ হলো, দলটির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান, নারীর প্রতি সম্মানবোধ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে মধ্যপন্থা অবলম্বন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একটি বড় বিষয়।

ফেব্রুয়ারীর মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে মানুষের মন জুড়ে থাকবে মহান একুশের চেতনা, যা ছিল বাংলাদেশ জন্মের ভিত্তি। বাংলাদেশের মানুষ এমন কোন ব্যবস্থা চায় না যেখানে নারীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা ও মর্যাদা হুমকির মধ্যে পতিত হবে। একই সাথে বাংলাদেশের মানুষ চায় দেশটা দুর্নীতিবাজ মুক্ত হোক। বিশেষ করে দেশের নতুন ভোটাররা দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিপরীতে ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বিশ্লেষণগুলো থেকে উঠে আসছে।

জরীপের ফলাফলগুলোই সত্য হবে এমন কোন কথা নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে ‘সুক্ষ কারচুপি’ বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে এবং প্রতিবার নির্বাচনের পরপরই এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছে, সেখানে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনেও যদি অতীতের মত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় তাহলে কোন জরীপের ফলই সত্য হবে না। তাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে নির্বাচন কতখানি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে। অতীতের প্রবণতা থেকে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনরা বা তাদের পছন্দের দলই অতীতে বিজয়ী হয়েছে।

এবারেও যে তাই হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত হলেও অতীতে নির্বাচন কমিশনের ইচ্ছা যাই হোক সরকারের ইচ্ছা ও পরিকল্পনারই জয় হয়েছে। এবারেও সরকারের বিশেষ ইচ্ছাকে জয়ী করার চেষ্টা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বিশেষ করে ‘হা’ ভোটকে জয়যুক্ত করার ব্যাপারে সরকারের চেষ্টা প্রকাশ্যেই দেখা গেছে। আর তাই নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয়েই সরকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের এমন পদক্ষেপ নির্বাচনী আইন পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

কোন জরীপের ফল সত্যি, কোনটা সত্যিকার অর্থেই জনমতের প্রতিফলন তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন যে পাবে তারাই সরকার গঠন  করবে।আওয়ামী লীগের ভোটারগণ যদি সত্যি সত্যি বিএনপিকে ভোট দেয় তাহলে কাঙ্খিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নিয়ে সংশয় থাকার কোন কারণ নেই। সব জরীপের ফল বলছে, মানুষ এখন ক্লিন ইমেজ তথা দুর্নীতি থেকে মুক্ত এবং জনগণের কাছাকাছি থাকেন বা জনবান্ধব প্রার্থী তাদেরই বেছে নেবেন। নারী ভোটার ও নতুন ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রেও তারাই রয়েছেন।

নারী ও তরুণ ভোটাররা উগ্রতা ও সহিংসতা একদম পছন্দ করেন না। তাই এবার নতুন প্রার্থী, অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থীদের অথবা যাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোন বড় ধরণের কোন অভিযোগ নেই, এমন প্রার্থীরা এবারে জয়লাভ করার সম্ভাবনা বেশি। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ ধর্মের চেয়ে প্রাথীর সততা ও অতীত কর্মকান্ডকে অধিক গুরুত্ব দিবে বলেই মনে হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক উৎসাহউদ্দীপনা থাকলেও নির্বাচনের আগের মূহুর্তে যদি কোথাও নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দেয় তাহলে ভোটের ফলাফল বদলে যেতে পারে। নিরাপত্তার প্রশ্নে সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা প্রবল এবং দেশের সকল নির্বাচনী কেন্দ্রে তাদের সরব উপস্থিতি জনমনে আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

ভোটের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে ভোটের মাঠ ততই সরব হয়ে উঠছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে ঘোষিত হচ্ছে নির্বাচনী ইশতেহার। সাধারণতঃ সকল দলের ইশতেহারই সুলিখিত ও অঙ্গীকারে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু মানুষ আসলে ঐ ইশতেহারের চাইতে দলের নেতাদের জনসংযোগের সময় দেয়া প্রতিশ্রম্নতি এবং তাদের অতীতের কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তবু এই আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা দলিল যা দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহি করা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের দেয়া আসনভিত্তিক অঙ্গীকারগুলোকেও লিপিবদ্ধ রাখা দরকার। এখন এটা নাই কিন্তু আমার মনে হয়, আসনভিত্তিক লিখিত ইশতেহার দেয়ার বিধান থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা, কৃষক ও কৃষির বিকাশ, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রযুক্তি সহায়তা ও মিড—ডে মিলসহ আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুনিশ্চিত করা, সর্বস্তরে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সহায়তা বৃদ্ধি করা, পরিবেশ সুরক্ষার মত বিষয়গুলো আগামীর নির্বাচনে অধিক গুরুত্ব পাক, দলগুলো সেই অঙ্গীকার পূরণ করুক এটা দেশবাসী প্রত্যাশা করে।

মানুষ চায় প্রতিশোধপরায়ণতা নয়, সকলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। ভয় নয়, ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান, ভোটের মাধ্যমে ভোটারদের সাথে যে চুক্তিবদ্ধতা আপনারা সৃষ্টি করছেন তা রক্ষা করবেন। কেবল প্রতিশ্রম্নতির ফুলঝুড়ি নয়, গুরুত্ব দিবেন জনগণের অধিকার ও মর্যাদা বাস্তবায়নে। সমতা ও নায্যতার নীতি হোক আগামীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি, বৈষম্য নয়।

– আতাউর রহমান মিটন, লেখক এবং কলামিস্ট