অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, এখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯১৩টি গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী জোরপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এসবের মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, এখনো অনেক ভুক্তভোগী বা স্বজন অভিযোগ নিয়ে আসছেন। তার মতে, প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, “গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভুক্তভোগীর খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা বিদেশে চলে গেছেন।” তিনি আরও জানান, এমন অনেক ভুক্তভোগী আছেন যাদের সঙ্গে কমিশন নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করলেও তারা অন-রেকর্ড বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

কমিশন সদস্যরা জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। তাদের ভাষায়, এটি একটি ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে, যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

কমিশন আরও জানায়, বেশ কয়েকটি উচ্চপ্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম এবং জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের গুমের ঘটনা।

কমিশন সদস্যরা জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা নিজে একাধিক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) তথ্য পাওয়া গেছে, যা থেকে স্পষ্ট হয়—এসব কর্মকাণ্ড সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি কমিশনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলো এক কথায় পৈশাচিক।”

তিনি আরও বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে কীভাবে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে মানুষের ওপর পৈশাচিক আচরণ করা যায়—এই রিপোর্ট তার ডকুমেন্টেশন। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর ও বিভৎস হতে পারে, এই প্রতিবেদন তারই প্রমাণ। যারা এসব ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদেরই সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে আমাদের এই নৃশংসতা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।”

প্রধান উপদেষ্টা রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় জনগণের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ করণীয় পেশ করার নির্দেশ দেন। তিনি আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ম্যাপিং করার নির্দেশনাও দেন।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তে বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে সেখানে ফেলে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুম করার তথ্য মিলেছে।

গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ও সার্বিক সহায়তা না থাকলে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।

এ সময় কমিশন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে গুমসংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায় এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করে।

রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।