মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ছয়টি সদস্যরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে এবং ইউরোপকে বিভক্ত করার কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোট—ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি (ইপিপি) ও সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস (এসঅ্যান্ডডিএস)—গত শনিবার রাতে এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি অনুমোদন করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ ইউরোপীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে। কারণ ইউরোপের সদস্যরাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে না; সব চুক্তি ইইউর কেন্দ্রীয় কাঠামোর মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়। যদিও গত বছরের জুলাইয়ে ট্রাম্পের চাপের মুখে একটি ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে তা কার্যকর হয়েছে, তবে ইইউর অভ্যন্তরে এখনো সেটির আইনি অনুমোদন মেলেনি।
শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে আমদানি হওয়া সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে এবং পরবর্তী সময়ে তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কোনো নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইপিপি নেতা ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেন, “আমরা সবসময়ই ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে ছিলাম। তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির কারণে এই মুহূর্তে অনুমোদনের প্রশ্নই আসে না।” বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আচরণ তাকে এমন এক অনিশ্চিত নেতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরছে, যিনি কখনো মিত্র আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন।
ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকি যেমন চুক্তিগুলোর অস্থিতিশীলতা প্রকাশ করেছে, তেমনি ইইউকেও নতুন করে সতর্ক করেছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইইউকে দুর্বল মনে করা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপকে আরও সক্রিয় করেছে। এ প্রেক্ষাপটে রোববার ইইউ রাষ্ট্রদূতদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত বছরের শেষ দিকে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক সতর্ক করেছিলেন, ইইউ যদি তাদের প্রযুক্তি আইন থেকে সরে না আসে, তাহলে ইস্পাতের ওপর শুল্ক কমানো সম্ভব হবে না। তবে সস্তা চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াই করার বিষয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এখনো এক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রযুক্তি আইন ও বাণিজ্য শুল্ক সংক্রান্ত যেকোনো একতরফা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এর ওপর আরোপিত ১২ কোটি ইউরো জরিমানার বিষয়ে অবস্থান থেকে সরে আসতেও তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



