ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে দেশের সব জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে। ভোরের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই বিভিন্ন এলাকার ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই উপস্থিতি দীর্ঘ সারিতে রূপ নেয়।
নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ—সব বয়সী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনেক কেন্দ্রেই উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে কেন্দ্রে এসেছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে অনেককে। দীর্ঘ সময় পর ভোট দিতে পারার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই ভিন্ন এক অনুভূতি বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।

নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে নির্বাচন কর্মকর্তারা কেন্দ্রে পৌঁছে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, সিল, ভোটার তালিকাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করেন। পোলিং কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক অবস্থান মিলিয়ে কেন্দ্রগুলোতে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে।
নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও পুলিশ, কোথাও র্যাব বা আনসার সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। ভোটারদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে তারা সক্রিয় রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটাররা ডাকযোগে (পোস্টাল ব্যালট) ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এবারের সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সারাদেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। ভোটগ্রহণ পরিচালনায় ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসারসহ মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসিসহ প্রায় ৯ লাখ সদস্য মাঠে রয়েছেন। সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন প্রতিনিধি ছাড়াও কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিকও নির্বাচন কাভার করছেন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা হয়েছে এবং ৫০০টির বেশি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে।



