যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, আর সামরিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে।
এই সংঘাত কীভাবে শেষ হবে—এ মুহূর্তে তা স্পষ্ট নয়। একবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কীভাবে এর সমাপ্তি টানতে পারে, সেই সম্ভাব্য পথগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ‘বিজয়’
যুদ্ধ শুরুর পর এক ভিডিও বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগ এনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দিতে সক্ষম।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বিজয়ের সংজ্ঞা ছিল কয়েকটি মূল লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ—
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌ ও সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া
আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর শক্তি কমিয়ে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে দেওয়া,বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের নজির ইতিহাসে খুব কম। ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্থলবাহিনী পাঠাতে হয়েছিল। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটেছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াই এবং ন্যাটোর সমর্থনের মাধ্যমে।
ট্রাম্পের কৌশল মূলত চাপ সৃষ্টি করে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। তবে এটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি।
নেতানিয়াহুর হিসাব
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের প্রধান হুমকি হিসেবে দেখেন। তাঁর দৃষ্টিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
ইসরায়েলের লক্ষ্য হতে পারে— ইরানের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্ষমতা সীমিত করা তবে ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর জন্য ‘বিজয়’ মানে টিকে থাকা। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো বহুস্তরবিশিষ্ট। নিয়মিত সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আধা-সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্রিয়।
আইআরজিসি শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতেও প্রভাবশালী। তাদের পাশাপাশি ‘বাসিজ’ নামে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী অতীতে বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা আদর্শিকভাবে ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগের ধারণায় অনুপ্রাণিত—যা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতীতের নজির কতটা আশাব্যঞ্জক?
ইতিহাস বলছে, সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযান প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করেছে।২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটে।লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর দেশটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত
ইরান ভৌগোলিক আয়তন, জনসংখ্যা ও কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র। সেখানে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সংঘাত কোন দিকে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে—
সীমিত যুদ্ধ ও কূটনৈতিক সমাধান – চাপ ও পাল্টা হামলার পর মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি
দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত – উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন – যা অনিশ্চিত এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় হলেও ইরান টিকে গেলে আঞ্চলিক সমীকরণ নতুনভাবে নির্ধারিত হবে। আর যদি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে, তবে পরবর্তী শূন্যতা পূরণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: জেরেমি বোয়েন, পদবি: আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, বিবিসি



