দেশে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে, বাজেটের ব্যয় মেটাতে সরকারের ব্যাংক ঋণ ক্রমশ বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। মূলত, জুলাই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত এই নিট ঋণ ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উঠে এসেছে।
সরকারের ব্যাংক ঋণ ও রাজস্ব আয়ের ঘাটতি
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন এবং অন্যান্য ব্যয় মেটাতে সরকারের অর্থের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যাংকখাত থেকে ঋণ নিয়ে সরকার নিজেদের চাহিদা পূরণ করছে।
এনবিআরের শুল্ক-কর আদায় এবং বর্তমান পরিস্থিতি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে কর আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রথম আট মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংস্থাটি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। প্রতি বছরের মতোই শুল্ক-কর আদায়ের এই বিশাল ঘাটতি থেকে এনবিআর বের হতে পারছে না। ফলে, সরকারকে অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি উৎস ও অভ্যন্তরীণ ঋণের চিত্র
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাস ১৯ দিনে সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে। এটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫৫ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকেও সরকার ঋণ নিয়েছে ছয় হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এ বছর এই খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ ও সরকারের ব্যাংক ঋণ
এই বিশাল পরিমাণ ঋণ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী এই বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় সেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে, পর্যাপ্ত রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে এখন ব্যাংক থেকে এত বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য ও ঋণের স্থিতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছর শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ছিল চার লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু, চলতি অর্থবছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত তা বেড়ে পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৬২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কমাতে সরকারকে এখন রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে দ্রুত মনোযোগ দিতে হবে।



